সেবা, সৌজন্য ও সতর্কতা : সজল ছত্রী

পূবের হাওয়া ডেস্ক
প্রকাশিত হয়েছে : ২৩ এপ্রিল ২০২০, ৬:০৫ অপরাহ্ণআমাদের দেশে সাধারণ মানুষের পর পেশাজীবীদের মধ্যে করোনায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে চিকিৎসক, পুলিশ আর সাংবাদিক। প্রথমটা আঁতকে ওঠার মতো। অসুস্থ হলে তো সবার আগে চিকিৎসকের কাছে যাবো। তারাই যদি আক্রান্ত হতে থাকেন তো যাবো কোথায়? তো ডাক্তাররাও ভয় পেলেন। কেউ কেউ ঘরের দোর লাগিয়ে দিয়ে বসে থাকলেন। হাসাপাতালে যাবেন না, সেবাও দিবেন না। নিজে বাঁচলে তবে না বাপের নাম!
প্রধানমন্ত্রী খেপলেন। বললেন, এমন মানসিকতা যাদের তাদের চাকরি থেকে বের করে দেওয়া হবে। এমন অবস্থায় জাতির টান টেনে নির্মম সত্যটা সামনে আনলেন দায়িত্বে থাকা অন্য চিকিৎসকরা। সঠিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া এই করোনা মহামারির সময়ে চিকিৎসকরাই বা কিভাবে সেবা দেবেন? তাদেরও তো ঘরবাড়ি স্ত্রী সন্তান আছে।
প্রধানমন্ত্রী বললেন, এটা একটা যুদ্ধ। সারা বিশে^র চিকিৎসকরা এই যুদ্ধে সাহসের সাথে অংশ নিচ্ছে, আমাদের দেশে কেন নয়?
চিকিৎসকরা মানলেন কিন্তু বললেন, যুদ্ধ করতে অস্ত্র লাগে, নিরাপত্তা বর্ম লাগে, প্রশিক্ষণ লাগে। এসব কিছু ছাড়া সৈনিককে যুদ্ধে নামিয়ে দেওয়া মানে তো তাকে আত্মহত্যা করতে উদ্ভুদ্ধ করা।
কথা সত্য। স্বাস্থ্যখাতে হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ হচ্ছে বটে কিন্তু সেই টাকা কোথায় ব্যয় হচ্ছে তা উচ্চ থেমে নি¤œপর্যায়ের সরকারি কর্মচারিদের ব্যাংক একাউন্ড দেখলে বোধহয় কিছুটা ঠাহর করা যাবে। সামান্য দুর্যোগেও চিকিৎসা দেবার মতো সামর্থ আমাদের নেই। এটা এখন আর লুকানোর মতো কিছু নয়। যা সামান্য আছে তা রাজধানীর। এর বাইরে শূন্যকলস বাজানোর চেষ্টা। কাগজে আছে গোয়ালে নেই। তবু চিকিৎসকদের দোষ দেওয়া।
পুরোপুরি নিরাপত্তা ছাড়া কারো চিকিৎসা দেওয়ার ঝুঁকি নেওয়াও কতটা যুক্তি সংগত?
যেমন সিলেটে প্রথম করোনায় আক্রান্ত হলেন যিনি, তিনি একজন চিকিৎসক। তিনি সিলেটের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর ভরসা রাখতে পারলেন না। অথচ এই চিকিৎসক নিজেই সিলেটের করোনা মোকাবেল টিমের সদস্য ছিলেন। তিনি ঢাকায় গেলেন, তবু রক্ষা হল না। তিনি মারা গেছেন। চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে বা অন্য যেকোনোভাবেই তিনি আক্রান্ত হন না কেন তিনি কিন্তু অসুস্থ বোধ করার আগে পর্যন্ত, অর্থাৎ যখন পর্যন্ত নিজেকে নিয়ে তার সন্দেহ হয়নি তখন পর্যন্ত সরকারি হাসপাতাল ছাড়াও নানান জায়গায় নানান রোগির সেবা দিয়েছেন। আদর্শে তিনি জামাতি ছিলেন বলে শোনা গেলেও চিকিৎসক হিসেবে কোথাও তার সামান্য দুর্নামও শোনা যায়নি। বরং গ্রামে তিনি ছিলেন গরিবের ডাক্তার। ছুটির দিনে অনেকটা বিনামূল্যে সেবা দিতেন।
এখন তিনি এই যে অসতর্ক হয়ে সেবা দিয়ে নিজে আক্রান্ত হলেন, এর দায় কার? তিনি নিজে আরো কতজনকে আক্রান্ত করে গেলেন?
২.
যা হোক, প্রধানমন্ত্রী বললেন, প্রয়োজনে বিদেশ থেকে ডাক্তার আনা হবে।
এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটা বক্রলেখা খুঁজে পেলাম, সেটা এরকম :
আমাদের দেশে বিদেশ থেকে ডাক্তার এনে নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা হল। কারণ তারা সাহসি এবং সেবায় প্রত্যয়ি।
বিদেশি ডাক্তার এলেন বটে, এসেই পড়লেন মহাবিপদে। নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্ন এলো, ‘উগান্ডার রাজধানীর নাম কী?’
৬ বছর ডাক্তারি শেখা বেচারা প্রশ্ন দেখে টাস্কি খেলেন! অবশেষে বিদেশি কোটায় নিয়োগ দেওয়া হলো, বেতন ২৬ হাজার।
তো লকডাউনের মধ্যে কাজ শুরুর এক পর্যায়ে পথে এক পুলিশ কনস্টেবলের সামনে পড়লেন সেই চিকিৎসক। নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিতেই কনস্টেবল চেতে গিয়ে বললেন, ‘বালের ডাক্তার!’
বিদেশি ডাক্তার অনেক কষ্টে উপজেলায় আসলেন। এসে দেখেন থাকার ব্যবস্থা যাচ্ছেতাই। দেয়ালে শ্যাওলা পড়া, জানালার কাঁচ ভাঙা, মশা ও সাপের উপদ্রব। হাসপাতালে গিয়ে দেখলেন আরো অদ্ভুত চিত্র।
রোগি আসে আর বলে গ্যাসের সমস্যা, শইল্যে কামড়ায়, বুকে জ্বলে। বেচারা বাধ্য হয়ে গ্যাসের ঔষধ আর ভিটামিন লেখা শুরু করলেন। এলাকার মাছ ব্যাবসায়ি এসে বলে ‘আমি এমপির লোক।’ ইউএনও অফিস থেকে ফোন দিয়ে বলে, ‘ড্রাইভারের বউয়ের প্রেশার মেপে দিয়ে যান।’ হার্ট অ্যাটাকের প্যাশেন্ট মারা যাওয়ায় ক্ষিপ্ত জনতা পিটালো ডাক্তার সাহেবকে। জরুরি অপারেশন করতে গিয়ে দেখল গøাভস নাই, মাস্ক নাই, বেøড নাই। হসপিটালে একটা এক্সরে মেশিন নাই, বøাড টেস্টের রিএজেন্ট নাই। শুধু নাই আর নাই।
আছে শুধু রোগি আর ডাক্তার।
অবশেষে দু দিনেই বেচারা বুঝে গেল এই দেশে ইউএনও সাহেবের পিওনের যে দাম, ডাক্তারের সে দামও নাই।
ফেরার পথে দেখা সেই পুলিশ কনস্টেবলের সাথে।
এবার ডাক্তার সাহেব নিজেই বললেন ‘আসলেই আমি বালের ডাক্তার, দুইটা বাড়ি দেন। এদেশে এসে যে ভুল করেছি, তার প্রায়শ্চিত্ত হোক।’
৩.
আমরা যারা সাংবাদিকতার পেশায় আছি তারাও কম ঝুঁকিতে নেই। একজন সহকর্মী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখলেন :
‘আমি একজন গণমাধ্যমকর্মী।
সাধারণ একজন রিপোর্টার।
সজ্ঞানে, সুস্থ মস্তিষ্কে, স্বেচ্ছায়Ñ
ঝুঁকিপূর্ণ এই পেশা বেছে নিয়েছি।
কেউ আমাকে ফোর্স করেনি।
কেউ আমাকে হাত জোড় করে, অনুনয়-বিনয় করে সাংবাদিক হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে বলেনি।
আমি জানি, এই পেশায় চ্যালেঞ্জ আছে, আছে প্রচÐ পরিশ্রম, সাফল্যে ‘হিরোইজম’র অনুভূতিও আছে।
আছে মানব ও প্রকৃতির সেবার সুযোগ, আছে যশ, খ্যাতি, সম্মান প্রাপ্তির উন্মুক্ত দুয়ার।
আমি, এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় যোগদান করেছি এর কাজের ‘ধরন’ জেনেই।
যুদ্ধ, মহামারি, বন্যা, খরা, ঝগড়া বিবাদ, উৎসব, ক্রিড়া ও দুর্যোগের সময় তথ্যসেবা প্রদানের কাজ করে যাওয়াই এ পেশার মূল ‘ধর্ম’ ও ‘শর্ত’।
এতে, ব্যক্তিগত অনেক সুখ স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিতে হয়; এটা এই পেশার সহজিয়া বৈশিষ্ট্য। এটাও আমার অজানা নয়।
এখানেই অন্য আট-দশটা পেশাজীবি থেকে আমার ভিন্নতা।
…স্পষ্ট করেই বলছি; এই ভিন্নতা আমার গর্ব; কোনোভাবেই গরিমা নয়।
দুর্যোগে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করাও এই পেশারই সহজাত প্রবৃত্তি। এটা আমি মাথা পেতে নিয়েছি।
খুব সহজভাবে বলছি, এই দুর্যোগের সময়টাতে কাজ করে, নিজেকে ‘আহামরি’ কিছু একটা ভাবতে চাই না।
যারা এই সময়ে দায়িত্ব পালন করে নিজেদের ‘আহামরি’ কিছু একটা ভাবছেন; তারা ভুল করছেন। নিজেদের পেশার শর্ত ও ধর্মের সাথে বেঈমানি হচ্ছে।
খুব সহজ কথা, এই সংকটময় মুহূর্তে পেশাগত দায়িত্ব পালন করছি বলেÑ আমি ‘ব্রাহ্মণ’ গোছের ‘আহ্লাদি’ কিছু একটা হয়ে যাইনি।
যারা এমনটা ভাবছেন, তারা ঘোর অন্ধকারে আছেন; পেশার শর্ত ভঙ্গ করছেন।
তবে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আমি কেবল চাইতে পারি, আমার ন্যূনতম শারিরীক-মানসিক সুরক্ষা, নিরাপত্তা, ও রুটিরুজির নিশ্চয়তাটুকু।
এটুকু আমার অধিকার।
..আবারও বলছি, এই সংকটে বাড়াবাড়ি ‘আহ্লাদি’ আমার অধিকার নয়; কারণ আমি এই পেশার ‘শর্ত ও ধর্ম’ জেনেই খাতায় নাম লিখিয়েছি।
সবাই ভালো থাকুন, নিরাপদে থাকুন, অন্যকে বাঁচতে সাহায্য করুন।’
বিরুদ্ধাচারণ নয়, চাপা ক্ষোভ থেকেই আসলে আমি লিখলাম : আমার দেখায়, আমার অভিজ্ঞতায়, বাংলাদেশের কোনো ‘সাধারণ রিপোর্টার’ নিজেকে ‘সাংবাদিক’ ‘গণমাধ্যমকর্মী’ এইসব দাবি করার এখতিয়ার রাখে না। যদি রাখে তো সেটা তার অতি আত্মবিশ্বাস মাত্র। আমি পুরোপুরি সত্যÑ তা দাবি করছি না, ব্যতিক্রম থাকতেই পারে কিন্তু ‘সাধারণ রিপোর্টাররা’ চ্যানেল বা পত্রিকার তথ্যদাতা চাকুরে মাত্র। এর চেয়ে কিছুটা আদর্শ সাংবাদিকতা হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই। তবে গুজব আর নকলের ছড়াছড়ির জন্য সেটা মূল্য পায় না। তাই ‘আলাদি’ তো আমি কখনোই হতে চাই না, করোনার কালে গর্ব প্রকাশেরও কিছু পাই না।
কেউ একজন ব্যতিক্রম কিছু করতে পারলে কিছুটা ঈর্ষা তো হবেই, কিন্তু পুরো বিষয়টা দেখে ভালও লাগবে অনেক! অপেক্ষায় থাকলাম।
আরেক সহকর্মী প্রশ্ন রাখলেন,তাইলে সাংবাদিক কারা?
আমার মনে হল, যে নিজের মতো সংবাদ সংগ্রহ করে নিজের মতই পরিবেশন করে। কারো বাঁধা ছকে নয় সেই নিজেকে সাংবাদিক দাবি করতে পারেন। আমি অন্তত এমন কাউকে দেখছি না, কিন্তু ইতিহাস বলে, ছিল; হয়ত এখনো আছে।
৪.
নিশ্চিতভাবেই পৃথিবীটা একটা সময় ছিল ¯্রফে টিকে থাকার। মানে বেঁচেবর্তে থাকার। ভোগ আর উপভোগের তখনো ফারাক নির্ণয়ের সময় আসেনি। তার পর ধিরে ধিরে মানুষ সামাজিক-সভ্য হয়েছে, আবিষ্কার করেছে ভোগ, সম্ভোগ ও উপভোগের নানান উপায়। তখন আরো কিছু বিষয় এসে জীবনাচরণে যুক্ত হয়েছে। তার মধ্যে সেরা হচ্ছে সেবা, দান ও ত্যাগ।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কমেন্ট লিখতে গিয়ে মনে হল: আচ্ছা যুক্তি-প্রমাণসহ ডাক্তারদের অনেক দিন ধরেই তো গালাগাল করে আসছি আমরা। এখন নতুন করে তাদের গোষ্ঠি উদ্ধারে লেগে লাভ কী?
ডাক্তার কী সেবক? কোনদিন ছিল?
সেবা বিষয়টা পয়সা ছাড়া শেষ কবে পেয়েছিলেন মনে আছে? যার কাছ থেকে পেয়েছিলেন, আপনি গলে পচে গেলেও প্রাণটা যদি থাকে ত সে আপনাকে এক ফোটা জল খাওয়াবার জন্য পাগল হয়ে যাবে।
ডাক্তার পুলিশ ক্লিনার নার্স ড্রাইভার নাপিত হোটেল বয় ধোপা মুচি চৌকিদার সবাই আপনাকে পয়সার বিনিময়ে সেবা দেয়… এমন কি স্বামী-স্ত্রীও… এমনটা ভাবতে ভাবতে, পয়সা দিয়ে সেবা কিনতে কিনতে নিজেরাই কখন নিজেদের পণ্য করে তোলেছি আমরা।
সেবাকারীরাও নিজেদের মূল্য ভুলে গেছে।
যে আপনার ময়লাটা পরিস্কার করে দিচ্ছে, যে আপনার ঘা’টা মুছে দিয়ে মলম লাগিয়ে দিচ্ছে… তাকে শেষ কবে ধন্যবাদ দিয়েছেন?
যে চোকিদার একাই চোর ডাকাত তাড়িয়ে দেবে মনে করে নিশ্চিন্তে স্ত্রীকন্যা নিয়ে ঘুমান, ভেবে দেখেছেনÑ আপনার মতো একটা পাতি-মানুষকে তাড়াতে কয় সেকেন্ড লাগবে তার? তবু তার নির্ঘুম রাত আপনার রাতকে মধুময় করে তোলে। সকালে ওঠে ধন্যবাদ দেন তাকে?
উঁচু ও নিচুতলার এসব সেবকদের ধন্যবাদ দিতে ভুলে যাই আমরা। টাকা দিচ্ছি, কিসের ধন্যবাদ! এই সুযোগে সেবাও হয়ে গেছে ব্যবসা। এখন দোষ কার?
বিভিন্ন দেশের স্বেচ্ছাসেবীদের উদাহরণও দেওয়া হচ্ছে। আর যাই হোক, নতুন কোনো স্বেচ্ছাসেবীর দরকার নাই আমাদের। প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দলের তো একটা করে স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন আছে। আপাতত স্বেচ্ছাসেবক লীগ আর দল মাঠে নামলেই কেল্লাফতেহ্।